বরিশাল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৪ এএম

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার অনুরোধও জানিয়েছে।
সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা বিমান হামলা জোরদার করায় লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ঘিরে উত্তেজনা এখন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
মোখা থেকে প্রণালি পর্যন্ত অগ্রযাত্রা
হুথি যোদ্ধারা লোহিত সাগর উপকূলের বন্দর শহর মোখা দখলে নেন বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর। এরপর তারা অগ্রসর হয়ে বাব আল-মানদেব প্রণালির মাঝামাঝি অবস্থিত মাইয়ুন দ্বীপ, যা পেরিম নামেও পরিচিত, দখলে নেন শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর। রয়টার্স জানিয়েছে, এর মধ্য দিয়ে হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থান নিশ্চিত করেছে, যা সৌদি আরবের জন্য বড় ধাক্কা—কেননা হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশটি তার বেশির ভাগ তেল রপ্তানি লোহিত সাগরের বন্দর দিয়েই করছিল। আল জাজিরার সাংবাদিক ইউসুফ মাওরি সানা থেকে জানিয়েছেন, উপকূল ও দ্বীপ হাতে আসায় হুথিরা এখন স্বল্প দূরত্ব থেকেই জাহাজে আঘাত হানতে সক্ষম, যেখানে আগে আক্রমণ চালাতে হতো ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে।
হস্তক্ষেপ এড়াতে দুই পক্ষের চেষ্টা
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন বলে তিনজন সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনই সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে না গিয়ে শুধু গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ট্রাম্প নিজে শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর জানান, যুবরাজের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং হুথিরাও তার প্রশাসনকে ফোন করে সরাসরি সংঘাতে না জড়াতে অনুরোধ করেছে। হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব না দিলেও বলেন, লোহিত সাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, আর এক্ষেত্রে আঞ্চলিক মিত্রদের নেতৃত্ব দিতে দেওয়া হবে।
পাল্টা হামলা ও উত্তেজনা
হুথি সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি অভিযোগ করেছেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় সৌদি যুদ্ধবিমান তাইজ, মারিব, হুদাইদা, আল-জাওফ, সাদা, আমরান ও হাজ্জাহ প্রদেশে ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় খামিস মুশাইত ও তায়েফ ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এই হামলার জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন সারি। সৌদি নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ খামিস মুশাইত ও আবহা শহরে সতর্কতা জারি করে, আর জিজান অঞ্চলের আল-তাওয়াল প্রদেশে একটি ভূপাতিত বস্তুর আঘাতে দুজন আহত এবং একটি মসজিদসহ কয়েকটি ভবনের ক্ষতি হয়।
বন্দি মুক্তি
হুথি কর্মকর্তা আবদেলকাদের আল-মুরতাদা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক অগ্রাভিযানে দখল করা এলাকা থেকে তাদের ২১০ জন সদস্যকে মুক্ত করা হয়েছে, যারা সৌদি-সমর্থিত সরকারপন্থী বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। এএফপিকে তিনি বলেন, এসব বন্দি আট বছর পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। মুক্তি পাওয়া বন্দিদের একজন মোহাম্মদ ফাউজি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, এই মুহূর্তের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। উল্লেখ্য, গত মে মাসে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইয়েমেন সরকার ও হুথিদের মধ্যে ১,৬০০-র বেশি বন্দি বিনিময়ের সমঝোতা হলেও তা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
মানবিক সংকট ও বাস্তুচ্যুতি
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএমের কর্মকর্তা আবদুসাত্তর এসোয়েভ আল জাজিরাকে বলেন, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের দেশ এখন ইয়েমেন। সাম্প্রতিক উত্তেজনার আগেই দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে ৪৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল বলে জানান তিনি। তাইজ শহর থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক ইয়াসের হাসান জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষে হুদাইদা, তাইজ ও লাহজ থেকে অন্তত ৫,৬০০ পরিবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে মোট বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার। তহবিল-সংকটের কারণে জরুরি চাহিদা অনুযায়ী সবাইকে সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান এসোয়েভ।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরাক, লেবানন, স্পেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। ইরাকের পার্লামেন্ট স্পিকার হায়বাত আল-হালবুসি বলেন, সৌদি আরবে হামলা চালাতে ইরাকি ভূখণ্ড ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাইসান প্রদেশের জাজিরাত আল-তাইয়িব এলাকায় ড্রোন উৎক্ষেপণস্থল খুঁজে বের করতে অনুসন্ধান চালাচ্ছে ইরাকি বাহিনী, আর এরই মধ্যে ইরান সীমান্তের তিনটি ক্রসিং সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জুবা লিবিয়াকে হুথিদের এই অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করে বলেছেন, এটি ইয়েমেনের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতার জন্য হুমকি, যার প্রভাব পড়বে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নৌচলাচল, বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি সরবরাহেও।
তেলের বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হতো, আর বাব আল-মানদেব প্রণালিও বন্ধ হয়ে গেলে আরও প্রায় সাত শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ ও ১২ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির বিশ্লেষক ডেভিড শেংকার বলেন, হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—বিশ্বের এই দুই প্রধান জ্বালানি করিডরের ওপর ইরানের একসঙ্গে প্রভাব বিস্তার করাটাই ছিল সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা, যা এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কার্নেগি এনডাওমেন্টের বিশ্লেষক স্টিফেন ভার্টহাইম মন্তব্য করেন, ইরানের অর্থনীতিতে চাপ প্রয়োগ করে সংঘাত সীমিত রাখার যে কৌশল ট্রাম্প নিয়েছিলেন, হুথিদের এই অগ্রগতি তা ভেস্তে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকি ও দ্বিধা
রয়টার্স জানিয়েছে, ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযানে জড়ালে তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করা একটি সমঝোতা ভেঙে দিতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের ওপর বিমান হামলা বন্ধ রাখার বিনিময়ে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল। ইরানের সঙ্গে চলমান সাত মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এমনিতেই ব্যস্ত থাকায় নতুন এই ফ্রন্টে জড়ালে সম্পদ ও গোলাবারুদের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন। তবে হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্টের কৌশলগত সব লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট গোলাবারুদ ও মজুত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হাতে আছে। সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততায় অনিচ্ছুক হওয়ায় সৌদি বিমান অভিযানে গোয়েন্দা সহায়তা বাড়ানো ও ইয়েমেন সরকারকে কূটনৈতিক-বস্তুগত সহায়তা জোরদার করা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রেক্ষাপট
ইয়েমেনে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের পর থেকে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে সংঘাত চলে আসছে। দুই পক্ষ ২০২২ সালে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছালেও চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুথিরা লোহিত সাগরে জাহাজ ও সৌদি-সমর্থিত সরকারের ওপর হামলা নতুন করে শুরু করে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও জটিল ও বিস্তৃত করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই সংকট উদ্বেগের কারণ, কারণ বৈশ্বিক তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ে আমদানি ব্যয়ে।
সূত্র: Al Jazeera, Reuters
সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬
Developed By NextBarisal
মন্তব্য লিখুন