মো. তারিকুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০০ পিএম

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গত অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। সংস্থাটি ২০২০ সালে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল বলেছিল।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের নভেম্বরের মূল্যায়নে বিভাগভিত্তিক হিসাবও ছিল। টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের হিসাবে বরিশাল ও রংপুর বিভাগে প্রতি ১০০ জনে দরিদ্র ছিলেন ২৬ জন। জাতীয় হার ছিল ১৮ দশমিক সাত শতাংশ। খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ, আর ঢাকায় প্রায় ২০ শতাংশ। সর্বশেষ আপডেটের সংবাদগুলোতে আমরা বিভাগভিত্তিক নতুন হিসাব পাইনি।
বিশ্বব্যাংক মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম “Make Subsidies and Social Protection Work Better for the Poor”। এতে অর্থনীতি, ব্যাংক খাত ও জ্বালানি পরিস্থিতির পাশাপাশি দারিদ্র্যের হালনাগাদ চিত্র রয়েছে।
আন্তর্জাতিক হিসাবে দৈনিক তিন মার্কিন ডলার বা ৩৭০ টাকা বা তার কম আয় করাকে দারিদ্রতা হিসেবে দেখা হয়। সে হিসাবে দারিদ্র্যসীমায় হার এক দশমিক এক শতাংশ বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০ দশমিক এক শতাংশ হয়েছে।
এর ফলে এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ ওই সীমার নিচে নেমেছেন। জাতীয় দারিদ্র্যসীমায় হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক সাত শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক পাঁচ শতাংশে পৌঁছেছে বলে আনুমানিক হিসাব দিয়েছে সংস্থাটি। এনিয়ে জাতীয় হার টানা চতুর্থ বছর বেড়েছে।
প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণ জানিয়েছে, এই হিসাব বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্বব্যাংক ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। তার শিরোনামে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বৈশ্বিক মডেল বলা হয়। সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টউইগ শেফার তখন তিন দিনের সফর শেষ করেছিলেন। তিনি বলেন, চার দশকের মধ্যে একটি দেশ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে, বাংলাদেশ সেটি প্রমাণ করেছে।
বিবিসি বাংলা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, সত্তরের দশকে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। পাঁচ দশকে তা ২০ দশমিক পাঁচ শতাংশে নামে। বিবিএসের ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে হার দাঁড়ায় ১৮ দশমিক সাত শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের নভেম্বরের দারিদ্র্য ও সমতা মূল্যায়নেও ওই সময়ের হিসাব আছে। টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে প্রতি ১০০ জনে দরিদ্র ছিলেন ৩৭ দশমিক এক জন। যা ২০২২ সালে কমে হয় প্রতি ১০০ জনে ১৮ দশমিক সাত জনে। অতি দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক দুই শতাংশ থেকে নামে পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশে। প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়, ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়ে যায়।
ওই মূল্যায়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে দারিদ্র্য বছরে গড়ে এক দশমিক আট শতাংশ করে কমেছিল। পরের ছয় বছরে তা কমে এক দশমিক তিন শতাংশ । প্রবৃদ্ধির প্রতি এক শতাংশে দারিদ্র্য কমেছে দশমিক নয় শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এ গড় এক দশমিক পাঁচ শতাংশ।
সর্বশেষ আপডেটের মূল সংখ্যাগুলো এ রকম:
ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের তিন অর্থবছরে আরও প্রায় ৫৯ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে পড়েছেন। বিবিসি বাংলার হিসাবে চার বছরে এই সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। দুই হিসাব যোগ করলেই ৮০ লাখের অঙ্কটি আসে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের বরাতে ছয়টি বিষয়ের কথা এসেছে। বিষয়গুলো কোভিড মহামারি, জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর ও ভর্তুকি ব্যবস্থার দুর্বলতা। আমরা যেসব অন্য প্রতিবেদন দেখেছি, সেগুলোতে ছয় বিষয়ের তালিকাটি একইভাবে পাওয়া যায়নি। সেখানে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি, ব্যাংক খাত ও রাজস্বের তথ্য বেশি এসেছে।
প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল পাঁচ দশমিক আট শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে তা নেমেছে চার দশমিক দুই ও তিন দশমিক পাঁচ শতাংশে। সর্বশেষ অর্থবছরে হার তিন দশমিক চার শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে দশমিক পাঁচ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ কমেছে দশমিক সাত শতাংশ।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি জুনে চার দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরে সর্বনিম্ন। একই সময়ে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক চার শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগও কমেছে।
ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। সংস্থাটির হিসাবে ২০২৫ সালে আরও প্রায় আট লাখ কর্মসংস্থান কমার আশঙ্কা রয়েছে। নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২২ সালের ৪২ দশমিক আট শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক চার শতাংশে নেমেছে।
নতুন শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৫ সালের পর না হওয়ায় সর্বশেষ চিত্র নিখুঁতভাবে বোঝা কঠিন বলে প্রথম আলো জানিয়েছে। প্রায় ছয় লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান আগামী অর্থবছরে হতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি দারিদ্র্য দ্রুত কমাতে যথেষ্ট নয়।
প্রথম আলো ও ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের বিবরণ অনুযায়ী, গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক সাত শতাংশে নেমেছে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি আগস্টে ছিল ৮ দশমিক তিন শতাংশ। কম আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি আগস্টে আবার ঋণাত্মক হয়েছে। বিদ্যুতের গড় খুচরা দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ দশমিক সাত শতাংশ।
প্রথম আলোর বিবরণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্যাসে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। এখন চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানি করতে হয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে অনেক কারখানা সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কাজের সময় কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা কর্মী ছাঁটাই করেছে।
একই প্রতিবেদনে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় ১০৭ শতাংশ বাড়ার তথ্য আছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার কথা এসেছে।
টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক দুই দশমিক ছয় শতাংশে নেমেছে। ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক সীমা ১০ শতাংশ। খেলাপি ঋণের হার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ২০ দশমিক দুই শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক দুই শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জুনের মধ্যে ৭৬ হাজার কোটি টাকার জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা দিয়েছে।
রাজস্ব আয় জিডিপির আট শতাংশ থেকে বেড়ে আট দশমিক তিন শতাংশ হয়েছে। বাজেট ঘাটতি তিন দশমিক চার শতাংশ থেকে বেড়ে তিন দশমিক নয় শতাংশ হয়েছে। প্রথম আলো লিখেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক পাঁচ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৩৪ দশমিক আট শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সুশাসন এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোকে তিন অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ব্যাংকের সম্পদমান যাচাই দ্রুত শেষ করা এবং কর নীতি ও কর প্রশাসন আলাদা করার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ জ্বালানি ও সার ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষায় বছরে জিডিপির প্রায় তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ ব্যয় করে। টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ লক্ষ্যভিত্তিক নয়। শহরাঞ্চলের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ বাসিন্দা বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পান বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে একই বিষয়ে ভিন্ন বিবরণ এসেছে: সমাজের ওপরের ২০ শতাংশ ধনীর জন্য বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশ খরচ হচ্ছে।
নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিসর নিয়েও দুটি ভিন্ন হিসাব পাওয়া গেছে। টিবিএসসহ কয়েকটি প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না। দুই হিসাবের একক ও পরিসর আলাদা: একটিতে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবার ও যেকোনো কর্মসূচি, অন্যটিতে দরিদ্র মানুষ ও প্রধান কর্মসূচি।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সমাজের নিচের দিকের ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে সাত হাজার ১৪০ টাকার সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান। সবচেয়ে ধনীরা পান ১০ হাজার ৪৭২ টাকার সুবিধা। দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থাকা প্রায় ছয় কোটি ২০ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ধাপে ধাপে সর্বজনীন ভর্তুকি কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। টিবিএস ও ফাইবার২ফ্যাশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্য ভর্তুকি একত্র করা এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ নগদ সহায়তা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ উন্নত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারেন। সরকারের ব্যয় বাড়বে সামান্যই।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মার বরাতে বলা হয়েছে, বর্তমান পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দিলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা পেরোতে পারবেন। কার্ড যথাযথ ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত দরিদ্রদের হাতে পৌঁছালে এই সংখ্যা ২৮ লাখ ৫০ হাজারে উঠতে পারে। বিবিসি এটিকে ‘বছরে’ হিসেবে লিখেছে। অন্য প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে এসেছে, সময়ের উল্লেখ ছাড়া।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬
Developed By NextBarisal
মন্তব্য লিখুন