Advertise top
স্পেশাল

আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস: বাঁশ আসলে গাছ নয় নাকি ঘাস

বরিশাল নিউজ

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম    

আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস: বাঁশ আসলে গাছ নয় নাকি ঘাস
বাঁশ বাগান। ছবি: বরিশাল নিউজ

"বাঁশ দেওয়া" শব্দবন্ধটি বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে প্রায় প্রতিদিন—কাউকে ঠকানো, বিপদে ফেলা বা প্যাঁচে ফেলার অর্থে। তাই ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে "বিশ্ব বাঁশ দিবস"-এর কথা শুনলে অনেকেরই প্রথমে হাসি পেতে পারে। 

 

কিন্তু এই দিবসের সঙ্গে বাংলা ভাষার সেই ব্যঙ্গার্থক প্রবাদের কোনো সম্পর্ক নেই—এটি বাস্তবেই একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দিবস, যা পালিত হয় উদ্ভিদ হিসেবে বাঁশের গুরুত্ব তুলে ধরতে।

 

দিবসটির প্রকৃত ইতিহাস

২০০৯ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত অষ্টম বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেসে বিশ্ব বাঁশ সংস্থা (ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশন বা ডব্লিউবিও) প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর "বিশ্ব বাঁশ দিবস" হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধি এই সিদ্ধান্তে সর্বসম্মত সমর্থন দেন। ডব্লিউবিও-র তৎকালীন সভাপতি কমেশ সালামের উদ্যোগে দিনটি চালু হয়, এবং তখন থেকে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এই দিন পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘের গ্লোবাল কমপ্যাক্ট-ও এখন এই দিবসকে স্বীকৃতি দেয়।

 

দিবসটির লক্ষ্য হলো বাঁশ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করা—এর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, নতুন শিল্প গড়ে তুলতে বাঁশ চাষে উৎসাহ দেওয়া এবং স্থানীয় ঐতিহ্যে বাঁশের ব্যবহার টিকিয়ে রাখা। জাতিসংঘ ২০২১-২০৩০ সময়কালকে "বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক" ঘোষণা করার পর বাঁশের গুরুত্ব আরও বেশি আলোচনায় এসেছে, কারণ দ্রুতবর্ধনশীল এই উদ্ভিদ ক্ষয়প্রাপ্ত জমি পুনরুদ্ধার, মাটির ক্ষয় রোধ এবং কার্বন শোষণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

 

বাঁশ আসলে গাছ, নাকি ঘাস?

প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বলতে হয়—উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বাঁশ আদতে কোনো গাছ নয়, বরং এটি ঘাসজাতীয় (Poaceae পরিবারভুক্ত) উদ্ভিদ, যা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল উদ্ভিদগুলোর একটি। প্রচলিত বৃক্ষের মতো এর কাণ্ডে বাৎসরিক বলয় (annual ring) তৈরি হয় না এবং এটি ভূগর্ভস্থ রাইজোম বা মূলকাণ্ড থেকে দ্রুত নতুন কাণ্ড ছড়িয়ে বংশবিস্তার করে—অনেকটা সাধারণ ঘাসের মতোই।

 

তবে আইনি ও প্রশাসনিক দিক থেকে বিষয়টি সবসময় এত স্পষ্ট ছিল না। ভারতের ১৯২৭ সালের বন আইনে বাঁশকে দীর্ঘদিন "গাছ" হিসেবে গণ্য করা হতো, ফলে বনাঞ্চলের বাইরে থেকেও বাঁশ কাটা ও পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ ছিল। ২০১৭ সালে ওই আইন সংশোধন করে বাঁশকে বৃক্ষের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যার ফলে বনাঞ্চলের বাইরে বাঁশ চাষ ও কাটায় থাকা বিধিনিষেধ শিথিল হয়।

 

বাংলাদেশে বাঁশের বাস্তব গুরুত্ব

বাংলাদেশে বাঁশ নিছক আলংকারিক কোনো উদ্ভিদ নয়—এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও নির্মাণশিল্পের একটি অপরিহার্য উপকরণ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নির্মাণকাজের অস্থায়ী কাঠামো, বিয়ের প্যান্ডেল কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের মঞ্চ তৈরিতে ব্যাপক হারে বাঁশ ব্যবহৃত হয় বলে জানিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। প্রতিবেদনটি অনুসারে, ঢাকায় কল্যাণপুর, রামপুরা, কামারপাড়া, সাইনবোর্ড, মেরাদিয়া, জিঞ্জিরা ও এরশাদনগরে বাঁশের বড় বাজার রয়েছে, আর টাঙ্গাইল থেকে আসা বরাক বাঁশ মজবুত ও পুরু হওয়ায় দেশের বাজারে সবচেয়ে ভালো বলে বিবেচিত হয়।

 

বরিশালে নতুন বাজার এলাকায় এই বাঁশ কেনা-বেচার জন্য নির্ধারিত স্থান রয়েছে। জায়গাটির নামই প্রচলিত হয়ে গেছে ‘বাউশ্শ্যার আহ্টখোলা’। মানে বাঁশের হাট।

 

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল—ময়মনসিংহ, শেরপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও চট্টগ্রামে বাঁশের উৎপাদন হলেও বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাঁশ চাষ হচ্ছে । এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে বছরে প্রায় ২ কোটি বাঁশের চাহিদা মেটাতে গিয়ে স্থানীয় বাঁশবাগান দ্রুত কমে যাচ্ছে বলেও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে—যা বাঁশ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত চাষের প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে আনে।

 

কেন এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ

বাঁশ শুধু নির্মাণ বা হস্তশিল্পের উপকরণ নয়—এটি মাটির ক্ষয় রোধ করে, পাহাড়ি ঢাল স্থিতিশীল রাখে, বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে এবং বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিশ্ব বাঁশ সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মতো নদীবিধৌত ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশে, যেখানে দ্রুতবর্ধনশীল ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণ-উপকরণের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে বাঁশের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর গুরুত্ব বিশেষজ্ঞরা বারবার তুলে ধরছেন।

 

সব মিলিয়ে, ১৮ সেপ্টেম্বরের এই দিনটি বাংলা ভাষার প্রচলিত রসিকতার "বাঁশ দিবস" নয়—বরং এটি এমন এক উদ্ভিদকে স্মরণ করার দিন, যা বাংলাদেশের নির্মাণ, কুটিরশিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নীরবে অথচ অপরিহার্যভাবে ভূমিকা রেখে চলেছে।


 


মন্তব্য লিখুন


সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬

Developed By NextBarisal