শরীফ হোসাইন, ভোলা
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২২ পিএম আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম

প্রত্যুষের আলো,যার অর্থ দাঁড়ায় অন্ধকার, নিরাশা বা দুঃখ কাটিয়ে নতুন আশা, জীবন ও সম্ভাবনার সূচনা। দ্বীপ জেলা ভোলায় পুকুর এনে দিচ্ছে সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত।
একসময় নদী কেন্দ্রিক জীবিকার জন্য পরিচিত ভোলা সদর উপজেলার এই ইউনিয়নে এখন নতুন করে পরিচয় তৈরি হয়েছে মাছ চাষকে ঘিরে। সেখানে জমিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে শত শত পুকুর। এসব পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতল, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
একটি পুকুর দিয়ে শুরু করে কারও খামার এখন ছড়িয়ে পড়েছে কয়েক ডজন পুকুরে। তাদেরই একজন মাকসুদ মাতাব্বর। শূন্য থেকে শুরু করে বর্তমানে ৩৫টি পুকুরে মাছ চাষ করছেন মাকসুদ। তিনি বললেন, নদীর পানিতে মাছ তুলনামূলক দ্রুত বাড়ে। খাবারের খরচও অনেক ক্ষেত্রে কম পড়ে। ফলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
মাকসুদের মতো কয়েকজন চাষির সাফল্য দেখে অন্যরাও মাছ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও যারা মাছ চাষকে বাড়তি আয়ের কাজ হিসেবে দেখতেন, তাদের অনেকেই এখন এটিকে ব্যবসা হিসেবে নিচ্ছেন।
মো. সানাউল্লাহ তাদের একজন । তার মতে, বাজারে মাছের ভালো দাম পাওয়ায় চাষিদের আগ্রহ বাড়ছে। তার দাবি, মাছ চাষের সঙ্গে বদল এসেছে উৎপাদন ব্যবস্থাপনাতেও। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন অনেক খামারেই দেখা যাচ্ছে।
মো. নোমান তেলাপিয়া ও পাঙাশ চাষ করছেন। মাছের পুকুরে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে ব্যবহার করছেন সার্জ এরেটর। মাছকে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দেওয়ার জন্য রয়েছে অটোমেটিক ফিডার মেশিন। এতে একদিকে শ্রম কমছে, অন্যদিকে নিয়মিত খাবার দেওয়ার কাজটিও সহজ হচ্ছে।
নুর নবীর খামারে রয়েছে পাঙাশ ও কার্পজাতীয় মাছ। রুই ও কাতল চাষ করছেন তিনি। তার পুকুরে মাছের জন্য অক্সিজেন সরবরাহে ব্যবহার করা হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ চালিত ফোর-হুইল এরেটর।
আলাউদ্দিনের পুকুরে তেলাপিয়া ও পাঙাশ চাষ হচ্ছে। তিনি ব্যবহার করছেন সার্জ এরেটর ও ফিডিং ট্রে।
নাজমা বেগমের পুকুরে রয়েছে রুই, কাতল ও মৃগেল। মাছের খাবার ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করছেন ফিডিং রিং, পাশাপাশি রয়েছে সার্জ এরেটর।
চাষিদের এসব উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তাও। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর সহযোগিতায় গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) বাস্তবায়িত স্মার্ট ফিসারিজ উপ-প্রকল্পের মাধ্যমে নির্বাচিত মাছচাষিরা বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পেয়েছেন। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, মাছের উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও খামার পরিচালনার বিষয়ে চাষিদের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
চাষিদের কথা, পুকুরে অক্সিজেন সরবরাহ, খাবার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তি তাদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় করছে।
চরসামাইয়ার পুকুরের পাড়ে ভোর হলেই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মাছের পাইকারদের আনাগোনা শুরু হয়। ভোলা শহর, বরিশালসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান নিয়ে তারা হাজির হন।
পুকুর থেকে মাছ তোলার পর শুরু হয় বাছাই। কোন মাছ কত বড়, কোন বাজারে যাবে-এসব হিসাব করে মাছ আলাদা করা হয়। এরপর চলে ওজন । দরদাম ঠিক হওয়ার পর মাছ উঠে যায় পিকআপ বা ট্রাকে। ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন বলেন, চরসামাইয়ার মাছের মান ভালো হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। তিনি এখান থেকে মাছ কিনে বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করেন।
আরেক ব্যবসায়ী মো. ফোরকানের ভাষায়, চরসামাইয়া এখন মাছের একটি বড় সংগ্রহ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখান থেকে মাছ কেনার জন্য বাইরের ব্যবসায়ীদের আগ্রহও বাড়ছে। এই বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। পুকুরে মাছ ধরা থেকে শুরু করে মাছ বাছাই, ওজন, খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ-প্রতিটি ধাপে তৈরি হয়েছে কাজের সুযোগ।
নদীতে মাছ কমে যাওয়ার কারণে যেসব জেলে আগের মতো আয় করতে পারছেন না, তাদের অনেকেই এখন মাছের খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কারও কাজ জাল টানা, কারও মাছ বাছাই করা, কেউ আবার মাছ পরিবহন করেন। কেউ কাজ করেন মাছের খাদ্য ও সরঞ্জাম সরবরাহের সঙ্গে। ফলে একটি পুকুরের উৎপাদন স্থানীয় অর্থনীতির আরও অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
চরসামাইয়ার এই পরিবর্তনের পেছনে অবশ্য নদীর বাস্তবতাও রয়েছে। একসময় নদী ছিল এই জনপদের মানুষের অন্যতম প্রধান জীবিকার উৎস। সেই নদীতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার পথে বসেছে। সেই জায়গায় পুকুর ভিত্তিক মাছ চাষ তৈরি করেছে বিকল্প আয়ের পথ।
মৎস্য বিভাগের সহযোগিতায় ঝুঁকি নিচ্ছেন মৎস্য চাষীরা
ভোলা সদর উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, চরসামাইয়ার মাছ চাষিরা মাছ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। মৎস্য বিভাগও তাদের কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহযোগিতা করছে। মৎস্য বিভাগের এই সহযোগিতার পাশাপাশি চাষিদের নিজস্ব উদ্যোগও এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ মাছ চাষে লাভের সম্ভাবনা থাকলেও এটি ঝুঁকিমুক্ত নয়। মাছের খাদ্যের দাম, রোগবালাই, বাজারদর, আবহাওয়া ও উৎপাদন খরচ-সবকিছুর ওপর নির্ভর করে চাষির লাভ-লোকসান।
তারপরও চরসামাইয়ার মানুষ এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। কারণ তাদের চোখের সামনে কয়েকজন চাষির সাফল্য তৈরি করেছে নতুন আস্থা। একসময় যে ইউনিয়নের পরিচয় ছিল নদী আর জেলেদের জীবনকে ঘিরে, সেখানে এখন পুকুরের পানিতে ভেসে উঠছে নতুন অর্থনীতির ছবি। সকালে পুকুরে মাছ ধরা, দুপুরে বাছাই ও ওজন, বিকেলে বাজারে সরবরাহ-একটি মাছের পেছনে জড়িয়ে যাচ্ছে চাষি, শ্রমিক, খাদ্য ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও পাইকারের জীবন।
চরসামাইয়ার মানুষের কাছে তাই মাছ এখন শুধু খাদ্য নয়, একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নামও। পাঁচ শতাধিক চাষি, শত শত পুকুর আর প্রতিদিনের বেচাকেনা মিলিয়ে গড়ে উঠছে একটি স্থানীয় মাছের বাজারব্যবস্থা। চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বেশি মাছের বেচাকেনা সেই পরিবর্তনেরই একটি বড় ইঙ্গিত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬
Developed By NextBarisal
মন্তব্য লিখুন