Advertise top
বিদেশ

বিশ্বজুড়ে সিক্স এএম হরর আতঙ্ক

বরিশাল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম    

বিশ্বজুড়ে সিক্স এএম হরর আতঙ্ক
সকাল ছয়টায় এক ইমেইলেই চাকরি হারানোর এ অভিজ্ঞতাকে বলা হচ্ছে সিক্স এএম হরর। ছবি: প্রতীকী

ভোর ছয়টা, ঘুম ভাঙতেই ফোনে একটি ইমেইল নোটিফিকেশন — আর তাতেই শেষ চাকরি জীবনের একটি অধ্যায়। ভারতে ওরাকলের কর্মীদের কাছে সম্প্রতি আসা এমন ছাঁটাইয়ের ইমেইল সামাজিক মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছে ‘সিক্স এএম হরর’ নামে। কেবল ভারত নয়, একই সময়ে জার্মানির ভক্সওয়াগন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত চলছে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই, যার একাংশে সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই)।

 

ভারতে ওরাকলের ‘সিক্স এএম হরর’

দ্য ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার, পহেলা সেপ্টেম্বর ভারতে ওরাকলের প্রায় ৩,০০০ কর্মী সকাল ছয়টার দিকে একটি ইমেইল পেয়ে জানতে পারেন যে তাদের চাকরি নেই। এর মধ্য দিয়ে ভারতে ওরাকলের মোট ছাঁটাইয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩ হাজারে, যা দেশটিতে সংস্থার মোট জনবলের প্রায় ১০ শতাংশ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম আমেরিকান বাজার অনলাইনের প্রতিবেদনেও একই তথ্য উঠে এসেছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আকস্মিক ছাঁটাইকে ‘সিক্স এএম হরর’ বা সকাল ছয়টার বিভীষিকা নামে অভিহিত করেছেন অনেকে। প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যম টেকটাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে একইভাবে ভোর ছয়টার ইমেইলে বিশ্বজুড়ে ওরাকলের প্রায় ৩০ হাজার কর্মীর চাকরি গিয়েছিল, যার মধ্যে ভারতেই ছিলেন প্রায় ১২ হাজার কর্মী। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দি ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই ইমেইলে লেখা ছিল, প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ব্যবসায়িক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং সেদিনই তাদের কর্মজীবনের শেষ দিন।

 

এআইয়ের বাজেটের জন্যই কি ছাঁটাই

করপোরেট বিশ্লেষক আনমোল গার্গ বলেন, ওরাকল আর্থিক ক্ষতির মুখে নেই, বরং এআই ডেটা সেন্টার কেনার বাজেট জোগাড় করতেই কর্মী ছাঁটাই করছে। ওরাকল বা অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার বাড়ানোর কথা বারবার বললেও ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে সরাসরি এআইকে কখনো দায়ী করেনি।

 

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ভারতে অ্যামাজনও প্রায় ১৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, যা দ্য হিন্দুর বরাতে জানা যায়। এটি ভারতে অ্যামাজনের মোট ৩০ হাজার কর্মী কমানোর পরিকল্পনার অংশ। মাইক্রোসফটও ভারতে প্রায় ৫০০ কর্মীকে কড়া কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এনেছে জানিয়েছেন বাজার গবেষণা সংস্থা ট্রেন্ডের কর্ণধার পারেখ জৈন।

 

জার্মানিতে ভক্সওয়াগনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ছাঁটাই

জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগনের বোর্ড আরও ৫০ হাজার চাকরি ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যার ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট এক লাখ পদ বিলুপ্ত হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী অলিভার ব্লুমে এক বিবৃতিতে বলেন, এই পদক্ষেপ কোম্পানির ভবিষ্যতের জন্য জোরালো বার্তা বহন করছে। এই ঘোষণা আসে বৃহস্পতিবার, তিন সেপ্টেম্বর।

 

তবে ওরাকল বা অ্যামাজনের মতো নয়, ভক্সওয়াগনের এই ছাঁটাইয়ের পেছনে এআই নয় বরং চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও বিক্রি কমে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। বিবিসি বাংলা জানায়, ইউরোপের সবচেয়ে বড় শিল্প শ্রমিক ইউনিয়ন আইজি মেটালের সভাপতি ক্রিস্টিয়ানে বেনার এই ছাঁটাইকে সংকট মোকাবিলার একটি কঠিন সিদ্ধান্ত বলে বর্ণনা করেছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রেও থামছে না ছাঁটাই

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও ছাঁটাইয়ের ধারা অব্যাহত আছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শ্রমবাজার পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাসের তথ্য উদ্ধৃত করে আইবিটাইমস ইউকে জানায়, শুধু আগস্ট মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ৫২,৮৮১টি চাকরি ছাঁটাইয়ের ঘোষণা এসেছে, যদিও এর মধ্যে সরাসরি এআইকে দায়ী করা হয়েছে মাত্র ৩,৪৬২টি ক্ষেত্রে। রাইড-শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান উবারও বুধবার, দুই সেপ্টেম্বর প্রায় ৩,৩০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়, যদিও প্রধান নির্বাহী দারা খোসরোশাহি এর জন্য এআইকে দায়ী করেননি।

 

এআই কি সত্যিই দায়ী, নাকি অজুহাত

বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেরি সৌকালাস বিবিসিকে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান নির্বাহীরা ক্রমাগত বলছেন যে এআই সবার চাকরি কেড়ে নেবে। চলতি বছরের জুনে তিনি ও অধ্যাপক ব্রেট ফল্কের প্রকাশিত ‘এআই লেঅফ ট্র্যাপ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে সতর্ক করা হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একযোগে কর্মী ছাঁটাই করলে শেষ পর্যন্ত পণ্য কেনার মতো যথেষ্ট মানুষ অবশিষ্ট থাকবে না।

 

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও নিজের ব্লগে লিখেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি কমানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা থাকলে তিনি তা সমর্থন করতেন। তিনি ভবিষ্যতে কিছু কাজ কেবল মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার একটি ধারণাকে ‘হিউম্যান রিজার্ভড’ নামে অভিহিত করেছেন।

 

বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা

বাংলাদেশেও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও তাদের আউটসোর্সিং অংশীদারদের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণ কর্মী রয়েছেন, যাদের জন্য বৈশ্বিক এই ছাঁটাইয়ের ঢেউ গুরুত্বপূর্ণ এক সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআইকে ঢালাওভাবে দায়ী করার আগে প্রতিটি ছাঁটাইয়ের পেছনের প্রকৃত কারণ যাচাই করা জরুরি, কারণ প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন, বাজার প্রতিযোগিতা ও বাজেট সমন্বয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

 

সূত্র: BBC, The Economic Times, The Hindu, American Bazaar Online, TechTimes, The Independent, IBTimes UK


 


মন্তব্য লিখুন


সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬

Developed By NextBarisal