মো. তারিকুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৭ এএম

কম খরচে বা বিনা খরচে ঘরে বসে বাড়তি আয়ের সুযোগ খুঁজছেন? অনলাইনে এমন দশটি কাজ আছে, যেখানে হাজার টাকার নিচেই শুরু করা যায়।
দেশের তরুণ-তরুণীদের হাতে এখন স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ সহজলভ্য। ঘরে বসে সংসারের কাজ সামলে বা চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ খুঁজছেন অনেকেই। ভালো খবর হলো, অনলাইনে এমন অনেক কাজ আছে, যেখানে বড় বিনিয়োগ ছাড়াই শুরু করা যায়। শুধু দরকার একটি স্মার্টফোন বা পুরোনো ল্যাপটপ, নিয়মিত ইন্টারনেট সংযোগ আর ধৈর্য।
নিচে এমন দশটি অনলাইন সাইড হাসলের কথা তুলে ধরা হলো, যেগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিনা খরচে বা এক হাজার টাকার কম খরচে শুরু করা সম্ভব। প্রতিটির সঙ্গে আনুমানিক আয়ের একটি ধারণাও দেওয়া হলো, তবে বাস্তব আয় দক্ষতা, বাজার ও কাজের সময়ের ওপর নির্ভর করে কমবেশি হতে পারে।
এআই সহায়তায় ই-বুক লেখা ও বিক্রি
চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো বিনামূল্যের এআই টুল ব্যবহার করে বিষয়বস্তুর খসড়া তৈরি করা যায়, এরপর নিজের ভাষায় সম্পাদনা করে একটি ছোট ই-বুক দাঁড় করানো সম্ভব। ক্যানভার বিনামূল্যের সংস্করণেই প্রচ্ছদ বানানো যায়। অ্যামাজন কেডিপি বা নিজের ফেসবুক পেজ-গুগল ড্রাইভ লিংকের মাধ্যমে এই ই-বুক বিক্রি করা যায়, যেখানে হুবহু এআই-নির্ভর লেখা প্রকাশ করলে মান ও নীতিমালাগত ঝুঁকি থাকে, তাই সম্পাদনা জরুরি।
আয়ের ধারণা: প্রতিটি ই-বুক বিক্রিতে সাধারণত দুইশ থেকে আটশ টাকার মতো রয়্যালটি বা লাভ থাকে। মাসে কয়েকটি কপি বিক্রি হলে দুই থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব, তবে শুরুর দিকে বিক্রি কম থাকাই স্বাভাবিক।
সোশ্যাল মিডিয়া পেজ ম্যানেজমেন্ট
ছোট ব্যবসাগুলোর ফেসবুক পেজ চালানোর জন্য দক্ষ মানুষের চাহিদা বাড়ছে। পোস্ট তৈরি, কনটেন্ট শিডিউল করা এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখাই মূল কাজ। এই কাজ কেবল একটি স্মার্টফোন দিয়েই করা যায়, বাড়তি সফটওয়্যার কেনার প্রয়োজন পড়ে না।
আয়ের ধারণা: একটি পেজ সামলানোর বিনিময়ে মাসে পনেরো থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা আয়ের নজির রয়েছে। একাধিক পেজ নিলে আয় আরও বাড়ানো সম্ভব।
অনলাইন টিউশন
কোনো একটি বিষয়ে দখল থাকলে জুম বা ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়ানো যায়। স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের পাশাপাশি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীরাও অনলাইন টিউটর খোঁজেন। বিনামূল্যের ভিডিও কল অ্যাপ ব্যবহার করে এই কাজ শুরু করতে বাড়তি কোনো খরচ লাগে না।
আয়ের ধারণা: ঘণ্টাপ্রতি তিনশ থেকে আটশ টাকা সাধারণ হার। কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়ালে মাসে পাঁচ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং
নিজের ফেসবুক পেজ, ব্লগ বা ইউটিউব চ্যানেলে অন্য প্রতিষ্ঠানের পণ্যের লিংক শেয়ার করে বিক্রির ওপর কমিশন পাওয়া যায়। এতে নিজের কোনো পণ্য মজুত রাখতে হয় না। শুরুতে দরকার শুধু একটি সক্রিয় ফেসবুক পেজ বা ব্লগ, যা বিনা খরচেই খোলা যায়।
আয়ের ধারণা: শুরুর দিকে মাসে পাঁচশ থেকে পাঁচ হাজার টাকার মতো আয় সাধারণ। পেজ বা চ্যানেলে ফলোয়ার বাড়লে এই অঙ্ক কয়েকগুণ বাড়তে পারে।
ইউটিউব বা ফেসবুক কনটেন্ট তৈরি
রান্না, প্রযুক্তি পর্যালোচনা, ভ্রমণ বা দৈনন্দিন জীবনের গল্প নিয়ে ভিডিও বানিয়ে অনেকে আয় করছেন। মুখ না দেখিয়েও তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করা যায়, যা এখন বেশ জনপ্রিয়। স্মার্টফোনের ক্যামেরাই যথেষ্ট, দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন প্রথম দিকে নেই।
আয়ের ধারণা: বিজ্ঞাপন থেকে সাধারণত প্রতি হাজার ভিউতে একশ থেকে পাঁচশ টাকার মতো আয় হয়। স্পনসরশিপ পেলে একক পোস্ট বা ভিডিও থেকেই কয়েক হাজার টাকা আসতে পারে, তবে দর্শক তৈরি হতে সময় লাগে।
ক্যানভা টেমপ্লেট বিক্রি
বিনামূল্যের ক্যানভা অ্যাকাউন্ট দিয়েও রেজুমে, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা ইনভয়েসের টেমপ্লেট বানানো যায়। এসব টেমপ্লেট অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বা ফেসবুক গ্রুপে বিক্রি করা সম্ভব। একবার টেমপ্লেট তৈরি হলে বারবার বিক্রি করে আয় করা যায়।
আয়ের ধারণা: প্রতিটি টেমপ্লেট একশ থেকে পাঁচশ টাকায় বিক্রি হতে পারে। মাসে কয়েক ডজন বিক্রি হলে এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় সম্ভব।
এআই মডেল ট্রেনিংয়ের ছোট কাজ
বড় বড় এআই প্রতিষ্ঠান তাদের মডেল প্রশিক্ষণের জন্য ডেটা যাচাই, লেবেলিং বা উত্তর মূল্যায়নের মতো ছোট কাজের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মানুষ নিয়োগ দেয়। এসব প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করতে সাধারণত কোনো খরচ লাগে না, শুধু একটি যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ইংরেজি ভাষাজ্ঞান ও মনোযোগী কাজের অভ্যাস থাকলে এই কাজ শুরু করা যায়।
আয়ের ধারণা: প্ল্যাটফর্ম ও কাজের ধরন ভেদে আয় বেশ ওঠানামা করে, কোনো কোনো প্ল্যাটফর্মে দক্ষ কাজের জন্য ঘণ্টায় সর্বোচ্চ সাত মার্কিন ডলার পর্যন্ত (প্রায় আটশ টাকা) পাওয়া যায়, তবে সাধারণ মানের কাজে এই হার এর চেয়ে কম থাকাই স্বাভাবিক। নিয়মিত সময় দিলে মাসে পাঁচ থেকে পনেরো হাজার টাকার মতো আয় সম্ভব।
স্টক ছবি ও ভিডিও বিক্রি
স্মার্টফোনে তোলা মানসম্মত ছবি বা ছোট ভিডিও শাটারস্টক, অ্যাডোবি স্টক বা আইস্টকের মতো সাইটে বিক্রি করা যায়। প্রকৃতি, খাবার বা শহরের দৈনন্দিন দৃশ্যের চাহিদা এসব সাইটে বেশি। একবার আপলোড করা ছবি বছরের পর বছর ধরে আয় এনে দিতে পারে।
আয়ের ধারণা: প্রতিটি ডাউনলোডে সাধারণত কয়েক টাকা থেকে কয়েক ডলারের মতো কমিশন মেলে। শুরুতে মাসে পাঁচশ থেকে তিন হাজার টাকা আয় সাধারণ, ছবির সংগ্রহ বড় হলে এই অঙ্ক বাড়ে।
ফেসবুকে ছোট পরিসরে রিসেলিং
হাজার টাকার নিচের পুঁজি দিয়ে ছোট পরিসরে পোশাক, গয়না বা হাতে তৈরি পণ্যের রিসেল ব্যবসা শুরু করা যায়। ফেসবুক পেজ বা গ্রুপে বিনা খরচে পণ্যের ছবি পোস্ট করে অর্ডার নেওয়া যায়। পাইকারি দামে অল্প পরিমাণ পণ্য কিনে খুচরা দামে বিক্রির মধ্য দিয়ে লাভ আসে।
আয়ের ধারণা: প্রতিটি পণ্যে সাধারণত পঞ্চাশ থেকে তিনশ টাকার মতো লাভ থাকে। অর্ডারের সংখ্যা অনুযায়ী মাসে তিন থেকে বিশ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।
ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট
বিদেশি ছোট ব্যবসা বা উদ্যোক্তাদের ইমেইল ব্যবস্থাপনা, সময়সূচি ঠিক করা বা ডেটা গোছানোর মতো প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করেন ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টরা। ইংরেজিতে যোগাযোগ করার সক্ষমতা ও মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতা থাকলেই এই কাজ শুরু করা সম্ভব। ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে এই ধরনের কাজের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
আয়ের ধারণা: ঘণ্টাপ্রতি সাধারণত তিন থেকে আট মার্কিন ডলারের মতো (প্রায় সাড়ে তিনশ থেকে নয়শ টাকা) পাওয়া যায়। পার্টটাইম কাজ করলে মাসে দশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা আয় সম্ভব।
সতর্কতা জরুরি
অনলাইনে আয়ের নামে প্রতারণাও কম নয়। কোনো প্ল্যাটফর্মে যোগ দেওয়ার আগে তার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা এবং বড় অঙ্কের অগ্রিম টাকা চাওয়া কাউকে এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ। ওপরের আয়ের অঙ্কগুলো আনুমানিক ও বাজার পর্যালোচনার ভিত্তিতে দেওয়া, বাস্তব আয় ব্যক্তিভেদে কম-বেশি হতে পারে। ধারাবাহিক পরিশ্রম ও ধৈর্য ছাড়া অনলাইনে টেকসই আয়ের পথ তৈরি হয় না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬
Developed By NextBarisal
মন্তব্য লিখুন