মো. তারিকুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

বরিশাল শহরের একটি বুটিক দোকানের মালিক প্রতিদিন ফেসবুক পেজে ছবি দেন, কিন্তু লাইক-কমেন্ট আসে হাতে গোনা কয়েকটি। খুলনার আরেকজন উদ্যোক্তা একই ধরনের পণ্য বিক্রি করেও প্রতি সপ্তাহে নতুন ক্রেতা পাচ্ছেন গুগল সার্চ থেকে। পার্থক্যটা প্রতিভায় নয়—পার্থক্যটা কৌশলে।
ফেসবুক আর গুগলের কয়েকটি সাধারণ টুল সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ছোট ব্যবসাও ঘরে বসে নতুন ক্রেতা টানতে পারে, বাড়তি কোনো বিজ্ঞাপন খরচ ছাড়াই।
ফেসবুকে রিচ কমে যাচ্ছে কেন?
গড়ে একটি ফেসবুক পোস্ট এখন পেজের মোট ফলোয়ারের মাত্র সামান্য একটি অংশের কাছেই পৌঁছায়, কারণ প্ল্যাটফর্মটি ক্রমাগত পেইড বিজ্ঞাপনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম থেকে আসা ওয়েবসাইট ট্রাফিক বছরের পর বছর ধরে মোট ট্রাফিকের প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি স্থির হয়ে আছে। তবে হতাশ হওয়ার কারণ নেই—অনেক ব্যবসা যেখানে গড়ে মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ অর্গানিক রিচ পায়, সেখানে সঠিক কৌশল অনুসরণকারী পেজগুলো ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত রিচ পেতে পারে।
রিচ বাড়ানোর কার্যকর কিছু উপায়
ভিডিও ও রিল-কে প্রাধান্য দিন: মেটার অ্যালগরিদম সরাসরি আপলোড করা ভিডিওকে বেশি গুরুত্ব দেয়, আর ছোট-দৈর্ঘ্যের রিলকে এখন প্রধান কনটেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
নিয়মিত লাইভে আসুন: সপ্তাহে অন্তত একবার লাইভ করলে অ্যালগরিদম সেটিকে অগ্রাধিকার দেয় এবং রিপ্লে থেকেও নতুন দর্শক পাওয়া যায়।
প্রথম এক ঘণ্টায় সক্রিয় থাকুন: পোস্ট দেওয়ার পরপরই কমেন্টের জবাব দিলে অ্যালগরিদমে ইতিবাচক সংকেত যায়, ফলে পোস্টটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়।
শ্রোতা সক্রিয় থাকার সময় পোস্ট করুন: পেজ ইনসাইটস থেকে দেখে নিন কখন আপনার ফলোয়াররা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকেন এবং সেই সময় মেনে পোস্ট করুন, অনুমানের ওপর নির্ভর না করে।
এলাকাভিত্তিক টার্গেটিং করুন: ব্যবসা যদি স্থানীয় হয়, তাহলে নির্দিষ্ট এলাকার দর্শকদের টার্গেট করে পোস্ট দিলে প্রাসঙ্গিক মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়, যা এনগেজমেন্ট বাড়ায়।
গুগল বিজনেস প্রোফাইল: বিনামূল্যের এক শক্তিশালী দোকান
অনেকে এখনো একে পুরনো নাম "গুগল মাই বিজনেস" নামেই চেনেন। কেউ যখন গুগলে কোনো পণ্য বা সেবা খোঁজেন, তখন ওয়েবসাইটের আগে প্রথমেই চোখে পড়ে এই প্রোফাইল—ঠিকানা, ফোন নম্বর, খোলা-বন্ধের সময় আর রিভিউসহ। সম্পূর্ণভাবে পূরণ করা এবং যাচাইকৃত প্রোফাইল সাধারণ প্রোফাইলের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি ওয়েবসাইট ভিজিট আর ১২ শতাংশ বেশি ফোনকল এনে দেয়।
গুগল স্থানীয় সার্চ ব্যবহারকারীদের আচরণ বলছে, তারা প্রায়ই কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিয়েই সার্চ করেন। প্রায় ২৮ শতাংশ স্থানীয় সার্চ শেষ পর্যন্ত কেনাকাটায় গড়ায়, আর ৭৬ শতাংশ মানুষ স্থানীয় সার্চের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট দোকানে যান। রেটিং যত ভালো, ফলাফলও তত ভালো—৪.২ তারার বেশি রেটিং থাকলে ক্লিক, কল আর দোকানে ভ্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
প্রোফাইল অপটিমাইজেশনের সহজ ধাপ
১. প্রতিটি তথ্য হালনাগাদ রাখুন: নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর সব প্ল্যাটফর্মে একই রাখুন। ভুল বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য র্যাঙ্কিং কমিয়ে দেয়।
২. নিয়মিত ছবি ও পোস্ট দিন: সাপ্তাহিক পোস্ট করলে মাসিক পোস্টের তুলনায় প্রোফাইলে গ্রাহক-সক্রিয়তা প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়ে যায়।
৩. রিভিউ সংগ্রহ ও উত্তর দিন: গ্রাহকদের রিভিউ দিতে উৎসাহ দিন, আর প্রতিটি রিভিউয়ের—ভালো হোক বা মন্দ—বিনয়ী উত্তর দিন। এতে নতুন গ্রাহকের আস্থা বাড়ে।
৪. শীর্ষ অবস্থানের গুরুত্ব বুঝুন: স্থানীয় সার্চ ফলাফলের শীর্ষ তিনটি অবস্থান মিলিয়ে অধিকাংশ ক্লিক পায়, তাই প্রোফাইল যত সম্পূর্ণ ও সক্রিয় থাকবে, ওপরের দিকে থাকার সম্ভাবনা তত বাড়ে।
বরিশালের উদ্যোক্তাদের জন্য বাস্তব পরামর্শ
বরিশালের মতো শহরে যেখানে অনেক ক্রেতাই এখনো সরাসরি দোকানে গিয়ে কেনাকাটা পছন্দ করেন, সেখানে ফেসবুক আর গুগল প্রোফাইল একসঙ্গে কাজ করলে সবচেয়ে বেশি লাভ হয়। ফেসবুকে পণ্যের ভিডিও দেখিয়ে আগ্রহ তৈরি করা যায়, আর গুগল প্রোফাইল সেই আগ্রহী ক্রেতাকে দোকানের ঠিকানা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। দুটোই বিনামূল্যে করা যায়—দরকার শুধু ধারাবাহিকতা আর একটু কৌশলী পরিকল্পনা।
বড় বাজেটের বিজ্ঞাপন ছাড়াই, শুধু নিয়মানুবর্তিতা আর সঠিক তথ্য দিয়েই স্থানীয় একটি ব্যবসা এখন ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজের জায়গা করে নিতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬
Developed By NextBarisal
মন্তব্য লিখুন