বরিশাল নিউজ
প্রকাশ : ৩০ আগষ্ট ২০২৬, ০৪:৫৯ এএম

দীর্ঘ চার বছরের অপেক্ষার পর আবার খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দেশটির সরকার বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিতে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে। বিমান ভাড়াসহ পুরো অভিবাসন ব্যয় বহন করবে মালয়েশিয়া সরকার নিজেই।
বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম প্রধান গন্তব্য মালয়েশিয়া। সৌদি আরবের পরই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন এই দেশে। সবশেষ ২০২২ সালে কলিং ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পর এবার তা ফের চালুর ঘোষণা দিল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানিয়েছে শুক্রবার, ২৮ আগস্ট। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিমান ভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই কর্মীদের প্রথম বহর পাঠানো হবে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে, বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শ্রমবাজারটি পুনরায় সচল হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
দীর্ঘমেয়াদে ধাপে ধাপে প্রায় ২৪ লাখ শ্রমিক নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে মালয়েশিয়ার। প্রথম ধাপে বিনা খরচে যাওয়া এই ১০ হাজার কর্মীর মধ্য দিয়েই বিশাল এই কর্মসংস্থান-প্রক্রিয়ার সূচনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, এটি জনশক্তি রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় অর্জন।
রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ে যা ঘটেছে
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের এখতিয়ার এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের হাতে দেওয়া হয় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক সমঝোতা স্মারকে, যার তারিখ ছিল ১৮ ডিসেম্বর ২০২২। এই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর।
মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মী সরবরাহকারী প্রধান পাঁচ দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নেপাল ও বাংলাদেশ পেয়েছে প্রতিটি ২৫টি করে এজেন্সি। ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার পেয়েছে ১০টি করে।
বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি এজেন্সি আগের অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা থেকে বাছাই করা হয়েছে। এসব এজেন্সির অধীনে আরও ১০ থেকে ৭০টি করে সাব-এজেন্সিকেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এজেন্সিগুলোর তালিকা পাওয়া যাচ্ছে মালয়েশিয়ার ওয়েবসাইট এফডব্লিউসিএমএসে (fwcms.com.my)।
গত ছয় মাসের ধারাবাহিক অনুরোধের পর বাংলাদেশকে এই বিশেষ সুযোগ দিয়েছে মালয়েশিয়া, এমনটাই জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর ফলে সরাসরি অনুমোদিত ২৫টি এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও। ফলে মোট ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সি একযোগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে, যাকে মন্ত্রণালয় আখ্যা দিয়েছে ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবে।
দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার ফল
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এজেন্সি বাছাইয়ের কাজ করেছে বলে জানিয়েছে প্রথম আলো। এই বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি মালয়েশিয়ার।
শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পেছনে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের কথাও উঠে এসেছে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে আলোচনার পরই বিষয়টি আরও গতি পায় বলে জানিয়েছে প্রথম আলো।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, আগের সরকারের আমলে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও নানা অনিয়মের কারণে এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টাতেই তা আবার চালু হচ্ছে বলেও দাবি মন্ত্রণালয়ের।
মেডিকেল সেন্টার পরিদর্শন শেষে অনুমোদন
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারের তালিকা পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। এরপর মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি যৌথ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে প্রতিটি মেডিকেল সেন্টার সরেজমিন পরিদর্শন করে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিদর্শন শেষে ১৬টি মেডিকেল সেন্টারকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মালয়েশিয়া। এই পুরো যাচাই প্রক্রিয়ার কারণেই সময় বেশি লেগেছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
অভিযোগ নিষ্পত্তিতে মনিটরিং সেল
অভিবাসন-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ দ্রুত সমাধানে ২৪ ঘণ্টার একটি মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক চালু করবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতের বিষয়টি সম্প্রতি আরেকবার সামনে এনেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা ঠেকানো এবং বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।

সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী কাজ করেন মালয়েশিয়াতে। ছবি বরিশাল নিউজ
কত কর্মী নেবে মালয়েশিয়া?
তাৎক্ষণিকভাবে বিনা খরচে নেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার কর্মী। দীর্ঘমেয়াদে ধাপে ধাপে প্রায় ২৪ লাখ কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা আছে মালয়েশিয়ার, তবে কোন ধাপে কত জন যাবেন তার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
কবে থেকে শুরু হবে কর্মী পাঠানো?
মন্ত্রণালয় নীতিগত সম্মতির কথা জানায় শুক্রবার, ২৮ আগস্ট। তবে কর্মী পাঠানোর সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে যথাসময়ে পৃথক বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। ততদিন পর্যন্ত কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, মেডিকেল টেস্ট বা পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
বিনা খরচে যাওয়ার প্রক্রিয়া কেমন হবে?
বিমান ভাড়াসহ পুরো অভিবাসন ব্যয় বহন করবে মালয়েশিয়া সরকার নিজে। এই কর্মীদের বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানো হবে। ফলে বেসরকারি দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে টাকা লেনদেনের কোনো সুযোগ এই প্রথম বহরে থাকছে না।
কোন এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করা যাবে?
সরাসরি অনুমোদন পাওয়া ২৫টি এবং ‘অ্যাসোসিয়েট’ হিসেবে সুযোগ পাওয়া আরও ৩১২টি এজেন্সি মিলিয়ে মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে পারবে। তালিকা যাচাই করা যাবে মালয়েশিয়ার সরকারি ওয়েবসাইট এফডব্লিউসিএমএসে।
কী সতর্কতা মানতে হবে?
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা জারি না হওয়া পর্যন্ত কাউকে কোনো টাকা, মেডিকেল টেস্টের ফি বা পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়নি। এমন দাবি নিয়ে কেউ এলে তা প্রতারণা হতে পারে, তাই দালাল বা অনির্ভরযোগ্য মধ্যস্বত্বভোগী থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। অভিযোগ জানাতে চালু হতে যাওয়া ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্কই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬
Developed By NextBarisal
মন্তব্য লিখুন