Advertise top
বাংলাদেশ

পোশাক শ্রমিক আন্দোলন; তৌফিকের মৃত্যু ঘিরে উত্তেজনা

বরিশাল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম    

পোশাক শ্রমিক আন্দোলন; তৌফিকের মৃত্যু ঘিরে উত্তেজনা
আন্দোলনে নিহত তৌফিকের গায়েবানা জানাজা পন্ড, ইনসেটে নিহত পোশাক শ্রমিক তৌফিক। সংগৃহীত

ন্যূনতম মজুরির দাবিতে চলমান পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে হামলায় আহত তৌফিক শেখের মৃত্যুর পর গাজীপুরে উত্তেজনা বেড়েছে।

 

গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় বুধবার, ৪ নভেম্বর বেলা পৌনে ১টার দিকে তৌফিক শেখের গায়েবানা জানাজার প্রস্তুতি চলছিল। কর্মসূচিটি আগে থেকেই ঘোষণা করেছিল এনসিপি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জানাজার আগে এনসিপি ও শ্রমিক শক্তির কয়েকজন নেতা বক্তব্য দেন। এরপর জানাজা আদায়ের উদ্যোগ নিলে পুলিশ বাধা দেয়।

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বাধা উপেক্ষা করে জানাজার চেষ্টা করলে পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এতে উপস্থিত মানুষজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।

 

গাজীপুর মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার এস এম আশরাফুল আলম বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ফ্লাইওভারের নিচে কিছু লোক জড়ো হয়েছিলেন। তিনি জানান, তাদের প্রথমে সড়ক থেকে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তারা সরেননি। আশরাফুল আলম বলেন, “কে কোন উদ্দেশ্য জড়ো হয়েছে তা তো জানা যায় না। তাই তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে।”

 

এনসিপির মুখ্য সংগঠক আলী নাসের খান বলেন, তাদের কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ। তিনি নিহত শ্রমিকের হত্যার বিচার চান। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তার ভাষ্য, “আমাদের গায়েবানা জানাজা পড়তে না দিয়ে হামলা করা হয়েছে।”

 

মিরপুরে সড়কে মিছিল, শ্রমিকরা অনুপস্থিত

রাজধানীর মিরপুরে বুধবার, ৪ নভেম্বর সকাল থেকে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে একটি সাঁজোয়া যান ও জলকামান রাখা হয়। পাশের একটি গলিতে ২৫ থেকে ৩০ জন পুলিশ সদস্যকে অবস্থান নিতে দেখা যায়।

 

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি এবং যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে দুটি মিছিল করেন। তবে সড়কে শ্রমিকদের কোনো অবস্থান দেখা যায়নি। যান চলাচলও ছিল স্বাভাবিক।

 

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার বলেন, মিরপুর ১১ নম্বর ও শিয়ালবাড়ী এলাকায় শ্রমিকরা কয়েকবার রাস্তায় নামার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সকাল থেকে এক মিনিটের জন্যও কোনো রাস্তা বন্ধ ছিল না।

 

নারায়ণগঞ্জে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে সড়কে নামেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কয়েকটি কারখানার শ্রমিক। কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় বুধবার, ৪ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে তারা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এর আগে সোমবার, ২ নভেম্বর ও মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর একই দাবিতে তারা সড়ক অবরোধ করেন।

 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, শ্রমিকরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। তাদের মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা হয়। এরপরও না সরায় টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। তার ভাষ্য, “আমরা কোনোভাবেই রাস্তা দখল করে জনভোগান্তি তৈরি করতে দেব না।” বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগে কয়েকজনকে আটকের কথাও জানান তিনি।

 

এক ফার্মেসি দোকানির বর্ণনায়, জড়ো হওয়ার পর শ্রমিকদের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রথমে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে পুলিশ এসে কথা বললে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। সে সময় বিএনপির নেতারা এসে শ্রমিকদের মারধর করেন।

 

টিয়ারশেলের কারণে একটি হোসিয়ারি কারখানার শ্রমিক জান্নাত (১৮) অসুস্থ হয়ে পড়েন। সহকর্মীরা তাকে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যান। সহকর্মী নার্গিস জানান, ঝামেলার পর কারখানা ছুটি দিলে তারা বেরিয়ে এসে টিয়ারশেলের মধ্যে পড়েন।

 

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর বিকেলে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। ওই ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক সার্কেল) শামীম হোসাইন।

 

গাজীপুরের মহাসড়কে সংঘর্ষ

গাছা থানার সাইনবোর্ড, বাংলাবাজার ও মির্জাপুর এলাকায় বুধবার, ৪ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক মহাসড়কে নেমে অবস্থান নেন। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পৌঁছালে শ্রমিকরা ইট-পাটকেল ছোড়েন। এরপর দুই পক্ষের সংঘর্ষ বেধে যায়।

 

পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, মহাসড়কে যান চলাচল এখন স্বাভাবিক। তার ভাষ্য, জয়দেবপুর, সালনা, রাজেন্দ্রপুর ও শফিপুরে পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে। বাংলাবাজার ও কাশিমপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

 

পল্লবীতে কারখানার সামনে উত্তেজনা

রাজধানীর পল্লবীতে মিরপুরের পূরবী সিনেমা হলের গলির কয়েকটি কারখানার সামনে বুধবার, ৪ নভেম্বর সকাল ৯টার দিকে শ্রমিকরা জড়ো হন। পুলিশ গিয়ে তাদের সরিয়ে দিলে উত্তেজনা তৈরি হয়। একই সময়ে রূপনগরের শিয়ালবাড়ী এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে তাদের ধাওয়া দিয়ে সরানো হয়।

 

একজন নারী শ্রমিক বলেন, “আমরা নিজেদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছি। কিন্তু কোনো গণমাধ্যম আমাদের সাক্ষাৎকার নেয় না।” তিনি দাবি করেন, শ্রমিকরা পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে আন্দোলন করেন। তার ভাষ্য, গাড়িতে যারা আগুন দিয়েছে, তারা বাইরের মানুষ।

 

এক দল শ্রমিকের অভিযোগ, নিরাপদে কাজ করার পরিবেশ নিয়ে কারখানার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন তারা। সে সময় পুলিশ দুর্ব্যবহার করে তাদের সরিয়ে দেয়। পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এমন কোনো ঘটনা নেই।”

 

তৌফিকের মৃত্যু: কে কী বলছেন

তৌফিক শেখ (২২) গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবিবর রহমান তবির ছেলে। স্বজনরা জানান, তিনি ছয়ঘরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ২০২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ নেন। বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

 

তৌফিকের বড় ভাই হারুন মিয়া সাংবাদিকদের জানান, সোমবার, ২ নভেম্বর আন্দোলনের সময় একটি হামলার দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করার চেষ্টা করছিলেন তৌফিক। হারুন মিয়ার ভাষ্য, “এ সময় হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হয় এবং তাকে বেধড়ক মারপিট করে।” তিনি বলেন, আন্দোলনরত শ্রমিকরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

 

পুলিশ ও স্থানীয়দের বর্ণনা কিছুটা ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, বাহাদুরপুর এলাকায় সংঘর্ষের দৃশ্য মোবাইলে ধারণের সময় আন্দোলনকারীরা লাঠি ও ইট দিয়ে তৌফিকের ওপর হামলা চালান। এতে তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পান। তাদের মতে, স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তৌফিক স্থানীয় ‘লায়লা স্টাইল লিমিটেড’-এর শ্রমিক ছিলেন বলেও জানান তারা।

 

কোচাশহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক জানান, উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর দুপুরে তৌফিকের মৃত্যু হয়। তার ভাষ্য, ছয়ঘরিয়া গ্রামে বুধবার, ৪ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় জানাজা হওয়ার কথা ছিল। এরপর গ্রামের কবরস্থানে দাফনের কথা ছিল।

 

গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি মো. মাহফুজ জানান, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর রাত ১০টার দিকে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। তৌফিকের মৃত্যুর পর বুধবার, ৪ নভেম্বর বাংলাবাজার এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। মোট কতটি কারখানা বন্ধ ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মামলা বা তদন্তের বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।


 


মন্তব্য লিখুন


সম্পাদক ও প্রকাশক: শাহীনা আজমীন ।। স্বত্ব © বরিশাল নিউজ ২০২৬

Developed By NextBarisal