ডা. মনীষার অভিযোগ সুজিত কুমার দেবনাথের বিরুদ্ধে

 বরিশাল নিউজ।। বরিশালে করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় বরিশাল বাসদের মানবিক সব কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়ার পায়তারা করার অভিযোগ তুলেছেন দলের সদস্য সচিব ডা.মনীষা চক্রবর্তী। অভিযোগের তীর বরিশাল সিটি কলেজের অধ্যক্ষ সুজিত কুমার দেবনাথের দিকে।

বাসদের দলীয় অফিসে রবিবার বেলা ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এই অভিযোগ করেন।

বরিশাল সিটি কলেজের অধ্যক্ষ সুজিত কুমার দেবনাথের কাছ থেকে সাবলেট হিসাবে অফিস ভাড়া নিয়েছিল বাসদ। কিন্তু তিনি এখন অগ্রিম এবং ভাড়া বাবদ অতিরিক্ত টাকা দাবি করছেন। অতিরিক্ত টাকা তা দিতে রাজী না হওয়ায় এবং অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য সময় চান ডা.মনীষা। কিন্তু সুজিত কুমার এরপরেও অপপ্রচারসহ তাদের কাজে নানা প্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টি করে করোনা চিকিতসা বাধা গ্রস্ত করছেন বলেন ডা.মনীষা । এমনকি বহিরাগতদের নিয়ে তাকে হুমকি দেয়া হচ্ছে অভিযোগ তার।

ডা.মনিষা চক্রবর্তী লিখিতভাবে জানান, ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে ‘করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনার দিয়ে আমাদের কার্যক্রম শুরু করে মার্চে  হ্যান্ডওয়াশ ও ব্লিচিং লিকুইড তৈরি ও বিতরণ করেছি। ২৬ মার্চ থেকে লকডাউনে দুস্থ মানুষদের সহযোগিতার জন্য ‘এক মুঠো চাল’ ও ‘মানবতার বাজার’ কর্মসূচিতে প্রায় ২০ হাজার পরিবারকে আমাদের দলের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছি। বিনামূল্যে চিকিৎসসেবা ও ঔষধ বিতরণ, সকল করোনা আক্রান্ত লকডাউন বাসায় খাদ্য ও ঔষধ সরবরাহের দায়িত্ব আমরা শুরু থেকে এখনও পালন করে যাচ্ছি। বরিশালে প্রথম ‘অক্সিজেন ব্যাংক’ চালু করেছি যা এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং এর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। আপনারা শুনে আনন্দিত হবেন যে, খুব দ্রুত আমাদের এই অক্সিজেন ব্যাংকে ৪টি আধুনিক অক্সিজেন কনসেট্রেটর যুক্ত হতে যাচ্ছে। ফলে বরিশালে আমরা আরও অনেক বেশি মানুষকে নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারবো। বরিশাল বিভাগের একমাত্র করোনা রোগী পরিবহনে করোনা ডেডিকেটেট অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস বিনামূল্যে আমরাই দিয়ে আসছি। এই সমস্ত কিছুই সম্ভব হয়েছে বরিশালসহ সারাদেশ এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভালবাসা, সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে।


মাতৃছায়া স্কুল, আমাদের কার্যালয় এবং এই কোচিং সেন্টারের স্থাপনা এবং জমির মালিক পারিবারিকসূত্রে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান ইমাম চৌধুরীরর উত্তরসূরি সন্তানেরা, বর্তমানে তাঁরা ঢাকায় অবস্থান করেন। তাঁরা বরিশাল সিটি কলেজের অধ্যক্ষ সুজিত কুমার দেবনাথের কাছে তা ভাড়া দিয়েছেন। অধ্যক্ষ সুজিত কুমার মূলভবনের কয়েকটি রুমে মাতৃছায়া স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনার করেন এবং অন্যান্য বিভিন্ন রুম বিভিন্ন জনের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। করোনাকালীন সময়ে আমাদের কার্যক্রমের ব্যপ্তি বৃদ্ধি পাওয়া এবং কোচিং সেন্টারটি বন্ধ থাকায় আমরা অব্যবহৃত এই ৪টি রুম ব্যবহারের অনুমতি চাইলে সুজিত কুমার আমাদের কার্যক্রমে খুশি হয়ে তা ব্যবহারের অনুমতি দেন। মালিক হাসান ইমাম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যবৃন্দও মাঝে মাঝে আমাদের ফোন করে কাজের খোঁজ খবর রাখতেন, সবসময়ই আমাদের কাজে উৎসাহ প্রদান করতেন, সহযোগিতাও করতেন।


কিন্তু গত জুন মাসে সুজিত কুমার দেবনাথ আমাদের ডেকে এই রুম ৪টি আমাদের কাছে ৫ লক্ষ টাকা এ্যডভান্স এবং ৩৫ হাজার টাকায় ভাড়া নেয়ার জন্য আমাদেরকে বলেন। আমাদের জন্য এত টাকা দেয়া কঠিন হওয়ায় পরবর্তীতে তিনি তিন লাখ টাকা এ্যাডভান্স এবং ৩২ হাজার টাকা ভাড়ার কথা বলে ৩ বছরের চুক্তি করার জন্য তাগাদা দিতে থাকেন। এই সময় হাসান ইমাম চৌধুরীর মেয়ে কাজের খোঁজখবর নিতে আমাদেরকে ফোন করার পর এই ৪টি রুম ভাড়া দেয়ার বিষয়টি জানতে পেরে খুবই অবাক হয়ে যান। তিনি আমাদেরকে জানান, এই ৪টি রুমের চুক্তি  সুজিত কুমারের সাথে ২০১৭ সালে শেষ হয়ে গেছে। ফলে  সুজিত কুমারের ভাড়া দেয়ার কোন এখতিয়ারই নেই। তিনি আমাদের আশস্ত করেন ঈদের পর তাঁরা বরিশালে এসে তাঁদের মতো করে নতুন ভাবে এই ৪টি রুম ভাড়া দেয়ার জন্য চুক্তি করবেন এবং ততদিন পর্যন্ত এই রুমগুলো ব্যবহার করে করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার কাজগুলো চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।


মালিক পরিবারের সাথে আমাদের আলোচনার বিষয়টি জানতে পেরে জনাব সুজিত কুমার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, করোনা দুর্যোগের সকল কাজ বন্ধ করে আমাদের রুমগুলো ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ প্রদান করতে থাকেন এবং আমাদের কাজগুলোকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করতে থাকেন। আমরা বিষয়টি বারবার বুঝানোর চেষ্টা করি যে, এই করোনা দুর্যোগের সময় অক্সিজেন ব্যাংক, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, ফ্রি চিকিৎসার বিষয়টি বন্ধ হয়ে গেলে বরিশালে অনেক করোনা আক্রান্ত রোগীরা আরও বিপদে পড়বে। কিন্তু তিনি ক্রমাগত টাকার জন্য চাপ দেয়ায় আমরা তাকে বলি ৩ বছরের চুক্তি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না, কিন্তু আমরা মাসিক ভাড়া হিসেবে যা চান তাই দিতে প্রস্তুত। তারপরও চাপ অব্যাহত থাকায় আমরা শেষ পর্যন্ত তাকে অনুরোধ করি যেহেতু এই সকল কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব না তাই অন্তত ১/২ মাস আমাদের প্রয়োজন নতুন কোন জায়গা খুঁজে বের করার জন্য। আর যদি এর মধ্যে সরকারিভাবে স্কুল-কলেজ বা কোচিং সেন্টার খোলার সিদ্ধান্ত হয় তাহলেও আমরা রুমগুলো ছেড়ে দিব। কারণ দীর্ঘদিন থেকে গড়ে ওঠা এই আয়োজন হঠাৎ করে কোথাও স্থানান্তারিত করা খুবই দুরূহ কাজ। এই করোনা মোকাবেলার কাজগুলো খুব সতর্কতার সাথে ভালোভাবে করার জন্য অন্তত ৩/৪ টি রুম প্রয়োজন হয়।  আমরা এই সমস্ত নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালন করতে পারায় শুরু থেকে অনেক করোনা আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে আসলেও আমাদের কোন ভলান্টিয়ারই এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়নি। তাই এই কথা আমরা সবাই বুঝতে পারছি আমরা চাইলেই এই কাজটি বন্ধ করা বা স্থানান্তারিত করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন : বরিশালে আক্রান্ত ৮,সুস্থ ৪০


এই পরিস্থিতিতে মালিক পরিবার আরও কিছুদিনের জন্য হলেও আমাদের কাজ করার জন্য সুজিত কুমারের কাছে বলার পরও তিনি তা না শুনে বিভিন্ন চক্রান্ত এবং ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন। আমরা এখানে করোনা রোগী রেখে চিকিৎসা করাচ্ছি যেখান থেকে এলাকায় করোনা ছড়াতে পারে বলে মিথ্যা কথা বলে আশেপাশের মানুষদের ক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করে, এমনকি আমাদের ভলান্টিয়ারদের সম্পর্কেও নানা বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালাতে থাকে।


শুধু অপপ্রচারেই তিনি ক্ষান্ত না হয়ে আমাদের করোনা মোকাবেলার কাজগুলোকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করতে থাকেন। ৪টি রুমের একটি তাঁর বিশেষ প্রয়োজন বলে মালিককে না জানিয়ে একজন আম বিক্রেতার কাছে ভাড়া দেন যা আমাদেরকে হতবাক করেছে, তার অর্থলিপ্সু চেহারা উন্মোচিত করেছে। এরপর স্কুল বন্ধ থাকার পরও স্কুল খোলা হবে-এই মিথ্যা কথা বলে স্কুল কম্পাউন্ডের বেঞ্চগুলো কোচিং এর বারান্দায় এনে রেখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। যেই বাথরুমে আমাদের ভলান্টিয়াররা পিপিই জীবাণুমুক্ত করতেন, নিজেরা গোছল করতেন সেই বাথরুমে তালা দিয়ে আমাদের সবাইকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। গেটে কাজ করার কথা বলে মূল গেটটি ৪/৫দিন থেকে শুধু তালাবদ্ধই করেনি দুই পাশে বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে ।


আবার মাতৃছায়া কিন্ডার গার্টেন স্কুলে কোন ক্লাস না হলেও মাঝে মাঝেই এই স্কুলের কয়েকজন শিক্ষিকাকে নিয়ে এসে আমাদের এই কাজে বাধা তৈরি করতে তাদেরকে ব্যবহার করার ঘৃণ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৪ তারিখে। এই দিন বিকালে সুজিত কুমার ২/৩ জনকে সাথে নিয়ে এই কম্পাউন্ডে ঢুকে ভলান্টিয়ারদের গালিগালাজ করতে থাকে এবং মানবতার বাজার ও মানবতার কৃষির ব্যানারদুটি খুলে ফেলে এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিতে থাকে এবং রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে আমাদেরকে ২/১ দিনের মধ্যেই উচ্ছেদ করবেন বলে শাসিয়ে যান।

 এরপর রাত ১০.৩০টার দিকে মহানগর ছাত্রলীগের কয়েকজনের নেতৃত্বে প্রায় ১৫/২০টি মোটরসাইকেল যোগে ২৫/৩০ জন যুবক মাতৃছায়া স্কুলে প্রবেশ করে সুজিত কুমারের রুমে মিটিং করে এবং পুরো এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করে। মিটিং শেষে তারা গেটের বাইরে রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি তৈরি করে। এরপরও আমরা ২৫ জুলাই সকাল  সুজিত কুমারের সাথে দেখা করে তাকে বারবার বুঝানোর চেষ্টা করি করোনা মোকাবেলায় এই কাজগুলো বন্ধ করা সম্ভব না বিধায় আমরা অন্যত্র কোথাও জায়গা পেলেই এই আয়োজনটা স্থানান্তারিত করতে পারবো। তারপরও নিজের চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়া এবং আমাদের এই রুমগুলো ব্যবহারের জন্য মালিকের অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি আমাদের রুম ছেয়ে দেয়ার জন্য বারবার হুমকি দিতে থাকেন।


বরিশাল নিউজ/ স্টাফ রিপোর্টার