‘এত দুর্ভোগেও থেমে নেই তারা’

কলাপাড়ার ধুলাসার ইউনিয়নের সমুদ্র ঘেষা দুর্যোগ কবলিত আশাখালী গ্রাম-বরিশাল নিউজ

মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)।। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুল, সামিউল, আঃ রহমান ও খাদিজা। প্রতিদিন প্রায় প্রায় চার কিলোমিটার কর্দমাক্ত রাস্তা হেঁটে তাদের স্কুলে আসা যাওয়া করতে হয়। দুর্ভোগ-দুর্যোগ তাদের নিত্যসঙ্গী হলেও স্কুলের হাজিরা খাতায় তারা নিয়মিত শিক্ষার্থী। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধুলাসার ইউনিয়নের সমুদ্র ঘেষা দুর্যোগ কবলিত আশাখালী গ্রামের এই শিক্ষার্থীরা ধুলাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
এদের মতো অন্তত ৩২ টি দুর্যোগ কবলিত গ্রামের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন ঝড়,পানিজট, কর্দমাক্ত রাস্তা, ভাঙ্গা সেতু-সাঁকো পার হয়ে নিয়মিত স্কুলে আসা যাওয়া করছে। অথচ সড়ক উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
বদলে যাওয়া উপকূলের কর্মক্ষম নতুন প্রজন্মের অভিভাবকদের শিক্ষাপ্রীতি ও সচেতনতায় গ্রামীন জনপদে শিক্ষার হার ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু বর্ষায় পথের দুর্ভোগ এখন শিক্ষার অগ্রগামীতায় প্রধান প্রতিবন্ধকতা ।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লালুয়া ইউনিয়নে সাতটি, ধুলাসার ইউনিয়নের পাঁচটি, ধানখালী ইউনিয়নের তিনটি, মহিপুর ইউনিয়নের চারটি, মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের চারটি, বালিয়াতলী ইউনিয়নের তিনটি, ডালবুগঞ্জ ইউনিয়নের তিনটি, লতাচাপলী ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের সহস্রাধিক শিৰার্থী এই পথ দূর্ভোগের শিকার।
বেহাল সড়ক,বিধ্বস্ত সেতু, ভাঙ্গা বেড়িবাঁধের কারনে এই শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে আসা যাওয়া করতে পারছে না।
ধুলাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিৰার্থী কামর্বল। তার ভাষায়,“হেই চর দিয়া (আশাখালী চর) হাইট্রা আই। হারা রাস্তা কাঁদা। বৃষ্টি হইলে তো হাটাই যায় না। বাড়ি দিয়া স্কুলে আইতে দেড় ঘন্টা লাগে। অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু স্কুলে আইলে ভালো লাগে। অনেক কিছু জানতে পারি।’
এই বিদ্যালয়ের প্রাক প্রাথমিকের শিক্ষার্থী খুকু মনি। তার বিষয়ে স্কুলের শিক্ষিকা সোনিয়া সুলতানা জানালেন, খুকুর বয়স মাত্র পাঁচ বছর। কিন্তু সকাল সাতটা বাজলেই স্কুলে চলে আসে। একদিনও স্কুলে আসা বন্ধ হয় না তার। ভাঙ্গা রাস্তা, অনেক দূরের পথ হলেও এই বয়সে এই শিশুর স্কুলপ্রীতিতে সবার স্নেহের এই খুকুমনি।
নিজামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির চার পাশে সড়ক এখন পানি বন্দী। রাস্তা ও চাষের জমি দূর থেকে চিহ্নিত করা মুশকিল। এই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে শিক্ষার্থীর হাঁটু পানি, কর্দমাক্ত রাস্তা পার হতে হলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
স্কুল ছাত্র সাথী ও তামিম। সাগরে মাছ শিকারে গিয়ে তাদের পিতা হাফেজ রহমান যখন নিখোঁজ হয় তখন তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী। কিন্তু বাবার মৃত্যুর শোক ভুলে তারা এখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম ও অস্টম শ্রেণিতে পড়ে। তারা জানায়, নিজামপুর গ্রামের হগল মানুষই পথদুর্ভোগের শিকার। পথ দুর্ভোগের কান্না ভুলে যান যখন তারা স্কুলে আসেন।
এসকেজেবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিৰক মো. জুনায়েদ হোসেন খান জানান, তাদের স্কুলে আসার প্রধান সেতুটি ভেঙ্গে বিধ্বস্ত হয়ে একদিকে কাঁত হয়ে পড়েছে। তার উপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে এখনও ছাত্ররা স্কুলে আসলেও ছাত্রীদের স্কুলে আসতে হচ্ছে প্রায় চার কিলোমিটার ঘুরে। এ অবস্থা চলছে কয়েক বছর ধরে।
ধুলাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিৰক মিজানুর রহমান বলেন, চার শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন স্কুলে উপস্থিত হচ্ছে। এদের দুই তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী এই বর্ষা মৌসুমে পথে দুর্ভোগের শিকার হলেও তাদের স্কুলে উপস্থিতির হার কমেনি। একই অবস্থা উপজেলার দুর্যোগ কবলিত ৩২ টি গ্রামের শিক্ষার্থীদের।
একাধিক অভিভাবক জানান, তারাই একদিন গ্রামীন জনপদের এই দুর্যোগ-দুর্ভোগ থেকে লাখো মানুষকে মুক্ত করবে।
ডালবুগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আঃ সালাম সিকদার বলেন, ইউনিয়নে মাত্র কয়েক কিলোমিটার সড়ক পিচ ঢালাই। বাকি সড়ক এখন মাটির কিংবা ইটের। এই বৃষ্টিতে অধিকাংশ সড়কে হাটাচলা চরম দুর্ভোগের।
বরিশাল নিউজ/রাজু