ভাগ্য ফিরবে নলচরবাসীর!



 শামীম আহমেদ।। বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন এক গ্রাম নলচর । প্রায় সাড়ে ছয় হাজার লোকের বসবাস। ইউনিয়ন ও উপজেলা সদরের সাথে গ্রামটির সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। যাতায়াতের জন্য ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ভরসা।

 মুজিববর্ষকে সামনে রেখে ৪৮ বছর পর বিদ্যুৎ যাচ্ছে বিচ্ছিন্ন ওই গ্রামে। এরই মাঝে পুরো গ্রামজুড়ে বসেছে বিদ্যুতের খুঁটি। আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে বিদ্যুতের তার টানানো ও বাড়ি বাড়ি মিটার সংযোগ দেওয়ার কাজ। তাই গ্রামের শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ সবাই খুশি।

 নলচরের ৭০ শতাংশ মানুষ এতদিন সোলার বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। সরাসরি বিদ্যুত সংযোগ পাওয়ার বহুদিনের আকাঙ্খা ছিল তাদের। সেই আশা পূরণ হতে চলায় তাদেও ধারণা নলচর গ্রামের ভাগ্যে পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, চাষাবাদ ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবক্ষেত্রে বিপৱব আসবে বলে আশা করছেন গ্রামবাসী।
 গ্রামবাসীরা জানান, বিদ্যুতের অভাবে এখানে অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। যে কারণে এ গ্রামে কোনো শিক্ষক বা চিকিৎসকও থাকতে চান না। এমনকি জন প্রতিনিধিরাও থাকেন না এখানে।
 তিনি আরও বলেন, চিকিৎসার জন্য মুমূর্ষু রোগীদের ট্রলারে করে যেতে হয় প্রথমে বুখাইনগরে। সেখান থেকে সড়কযোগে বেলতলা খেয়াঘাট, তারপর খেয়া পার হয়ে বরিশাল শহরের কোনো হাসপাতালে নেয়া হয়। এর মাঝে অনেক রোগীই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
 নলচর গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ আসলে আর কিছু হোক বা না হোক নলচরের মানুষ প্রযুক্তি ও আধুনিক বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হতে পারবে। সোলার বিদ্যুতের কারণে পুরো গ্রামে একটাও টেলিভিশন নেই, বিদ্যুতের অভাবে মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার না থাকায় তাদের প্রতিনিয়ত নেটওয়ার্ক বিরম্বনায় পরতে হয়। সরাসরি বিদ্যুত আসলে সবকাজে বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়ে যাবে। মটরের মাধ্যমে যেমন গভীর নলকূপ থেকে পানি তোলা যাবে, তেমনি তা সেচকাজেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

 লাবনী ও মারিয়া আক্তার নামের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়-য়া দুই শিক্ষার্থী বলে, প্রাথমিক ও নিন্ম মাধ্যমিকের কোনো শিক্ষকই গ্রামে থাকেন না। তারা সবাই প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে বরিশাল শহরে থাকেন।  সোলারের অল্প আলোতে পড়ালেখা করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় বলেও জানায় ওই দুই শিক্ষার্থীরা।
 সাড়ে ছয় হাজার মানুষের নলচর গ্রামে গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ছয়শ’। বিদ্যুৎ আসছে শোনার পর থেকেই মানুষের মাঝে কৌতূহল বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে গ্রামের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ও সড়কের পাশে খুঁটি বসানো হয়েছে। এখন তার টানানোর কাজ শুরু হবে। প্রতিটি কাজেই গ্রামের মানুষকে সম্পৃক্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে।

 এ ব্যাপারে বরিশাল-৫ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম বলেন, “মনে হয় আমিই প্রথম সংসদ সদস্য যে ওই গ্রামটি পরিদর্শন করেছি। উপজেলা চেয়ারম্যানও কখনো ওই বিচ্ছিন্ন গ্রামে যাননি। আমি যখন ওই গ্রামে গিয়েছিলাম তখন ওখানকার লোকজনই এ কথা আমাকে বলেছিল। ওই এলাকা, এলাকার মানুষ এক কথায় বরিশাল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ঘরে ঘরে বিদ্যুত এ প্রতিশ্রুতি শতভাগ সফল করতে ইতোমধ্যে আমরা ওই গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি বসিয়েছি। কিছু সোলারের সড়ক বাতিও দিয়েছি। আশা করি মুজিববর্ষের মধ্যে সবাই ভিন্ন ধরনের নলচরকে দেখতে পাবো।” প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নলচর গ্রামের মতো নদীবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ এলাকাতেও বিদ্যুৎ সংযোজনের কাজ শুরু হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে।
 বরিশাল নিউজ/স্টাফ রিপোর্টার