পদ্মা সেতুর গল্প শুনুন আইনুন নিশাতের কাছে

বাংলাদেশে ভাগ্য কয়েক বছর আগেও নির্ধারণ হতো প্যারিসে বসে। এখন সেই দিন নেই। বাংলাদেশ সরকার তাদের বলে দেয় “গো টু হেল।” কথাগুলো বলেছেন পানিসম্পদ ও জলবায়ূ পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত ।

অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত পদ্মা সেতু নির্মানের সাথে জড়িত শুরু থেকে। শুধু সেতু নয়, পদ্মার ভাষা জানেন তিনি। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে তার কাছ থেকে পদ্মার নতুন গল্প শুনুন। ওই কনফারেন্সে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি।

তিনি জানান, যমুনা এবং পদ্মা সেতু করার সময় বিশ্ব ব্যাংক জড়িত ছিলো। যমুনাতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলো, আর পদ্মা সেতুতে তারা পিছুটান দিয়েছিলো অদ্ভুদ একটা কারণ দেখিয়ে। যদিও পরবর্তীতে তারা বুঝেছে যে তাদের সিদ্ধান্তের ভুল ছিলো।

এসময় তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক পিছুটান দিয়েছে অনেক পরে। আর আমি মনে করি এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক কারনে, কোন কারিগরি কারণ ছিলো না । যার সাক্ষরে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারমধ্যে আমি অন্যতম একজন, যদি দুর্নীতি হয়ে থাকে তাহলে আমি অবশ্যই করেছি। কিন্তু আমি জানি আমি কোন দুর্নীতি করিনি।

ড. আইনুন নিশাত বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর সময়ে যে শক্ত পজিশন নিয়েছিলেন, সেটি আজকে শুধু সেতু বিভাগ নয় দেশের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডে বিরাট প্রভাব রেখেছে। বাংলাদেশে যারা অর্থ লগ্নি করে , তাদের আমি দাতা বলিনা কারণ তারা তো ফ্রি অর্থ দেয় না। ইন্টারেস্টসহ আদায় করে নেয়। তারা প্যারিসে বসে ঠিক করে বাংলাদেশে কি হবে, কোথায় কে কি করবে । এটা বন্ধ হয়েছে। কারণ বাংলাদেশ সরকার এখন বলে দেয় গো টু হেল।

তিনি বলেন,যমুনা সেতু তৈরি করতে না পারলে পদ্মা সেতুর কথা ভাবতে পারতাম না। যমুনা সেতুর অভিজ্ঞতা নিয়েই পদ্মা সেতুর কাজ হচ্ছে। আর যমুনা নদীকে সংকুচিত করা হয়নি। যমুনায় নদী ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার ছিলো সেজন্য সাড়ে ৪ কিলোমিটার ব্রিজ করা হয়েছে। ১৯৮৭-৮৮ এর বন্যায় এটা কিছুটা প্রশস্ত হলেও সেতু নির্মানের আগে নদী মূল জায়গাতে চলে আসে। যমুনা সেতুর সময় লেটেস্টে প্রযুক্তি গ্রহন করেছিলাম।

পদ্মা সেতুর সময় প্রযুক্তি অনেক অ্যাডভান্সট হয়েছে, আর সেগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। তবে পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণ কোনদিন স্বপ্নেও বিশ্বাস করতাম না। কারন এটা অত্যন্ত শক্তিশালী নদী। এখন ফেলোসিটি সাড়ে ৪ মিটার পার সেকেন্ডে। অর্থাৎ কী তীব্র স্রোত।

এখন অনেকেই না বুঝে অনেক কথা বলে দিচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েকদিনে যা প্রচার হচ্ছে, তাতে তারা বলছে দ্বিতীয় শক্তিশালী নদী এটা (পদ্মা), কিন্তু এটা প্রথম  শক্তিশালী নদী। এর থেকে বেশি প্রবাহ ঠিকই হচ্ছে আমাজনে। কিন্তু নদীর প্রশস্ততার ভিত্তিতে শক্তিটা পদ্মার সব থেকে বেশি। রাজশাহী শহরের দিকে ৪-৬ কিলোমিটার এ নদী প্রশস্ততা, আর প্রাকৃতিকভাবে নদীটা যখন মাওয়াতে আসলো তখন তার প্রশস্ততা দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার । ফলশ্রুতিততে এটা প্রচন্ড গভীর হয়ে গেছে এখানে। শীতের সময় এর গভীরতা ৮০-১০০ ফিট, বর্ষার সময় ডাবল হয়ে যায়। বর্ষার সময় পানি যখন উপরে উঠে যায়, তখন তলদেশও তার থেকে অনেক বেশি নিচে নেমে যায়। এই ন্যাচারাল স্ক্যাওয়ারে মাওয়ার কাছে পদ্মার গভীরতা ডাবল হয়ে যায়। এই গভীরতাতে সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণ পৃথিবীতে আর করা হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা নদীকে মারিনি। মাওয়ায় পদ্মার প্রবাহটা প্রবাহিত হয় মাত্র দুই থেকে তিন কিলোমিটার জুড়ে। আমরা গত দেড় থেকে দুইশত বছরের হিসেব কষে দেখেছি ১২ বছরের মধ্যে পদ্মা জায়গা পরিবর্তন করে। তবে তা ৬ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আমরা সেতু নির্মাণ করতে পারতাম তিন কিলোমিটার লম্বা  কিন্তু এটা বিপৎজনক হতো কারণ নদী এটা মানতো না। তাই আমরা নদীর ওপর পদ্মা সেতু ৬ কিলোমিটার করলাম। আর অ্যাপ্রোসরোডসহ গোটা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ১৫ দাড়ালো। আমি নদীর ওপর কাজ করেছি, তাই আমরা চেষ্টা করেছি বুঝতে- নদী কি চায়? আর সেটাই পালন করেছি। সেতু দেখলে নদী তার নীচ দিয়ে যেতে চায় না। পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। আপনি নদীর সাথে কথা বললে-সে বলবে আমাকে বেধোনা।

পদ্মা সেতু ফ্লাট হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নেভিগেশন চ্যানেল পরিবর্তন হতে পারে তাই পুরো সেতু জুড়ে ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়েছে। সারাবছর ধরে যাতে নৌযান চলাচল করতে পারে তাই বর্ষার সময় পানির উচ্চতা ধরে ব্রিজের উচ্চতা ঠিক রাখা হয়েছে। আর পদ্মাসেতুর শুধু সেতু অংশ কমপ্লিট হযেছে, নদী শাসন কমপ্লিট করতে আরো এক বছর লাগবে।

বরিশালনিউজ/ শামীম আহমেদ