প্লে বিশ্বে দ্য কিং হিসেবে পরিচিতি পান মাত্র ১৭ বছর বয়সে। সুইডেনে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে টুর্নামেন্টের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে জেতেন ট্রফি। ফাইনালে স্বাগতিক দলের বিপক্ষে ব্রাজিলের ৪-২ গোলের জয়ে দুটি গোল করে সতীর্থদের কাঁধে চড়ে বিশ্বজয়ের হাসি কখনও ভুলে যাওয়ার নয়।

পরের বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে ইনজুরির কারণে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেন পেলে। কিন্তু মেক্সিকোতে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়ে তিনি ছিলেন নায়ক। ইতালির বিপক্ষে ৪-১ গোলে ফাইনাল জয়ে গোল করেন এবং করান কার্লোস আলবার্তোকে দিয়ে।

পেলে এতটাই খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন যে ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়া তাদের গৃহযুদ্ধে বিরতি টানে যেন দেশটিতে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে পারেন তিনি। ১৯৯৭ সালে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে নাইট উপাধি দেন। উত্তর আমেরিকায় ফুটবলকে জনপ্রিয় করতে ওয়াশিংটনে সেবার ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান প্রথমে হাত বাড়িয়ে দেন, বলেছিলেন, ‘আমার নাম রোনাল্ড রিগান। আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু আপনাকে নিজের পরিচয় দেওয়ার দরকার নেই কারণ সবাই জানে পেলে কে?’

ফুটবলের রাজা ‘কালোমানিক’ পেলে ব্রাজিলের হয়ে খেলেছেন চারটি বিশ্বকাপ। এরমধ্যে ১৯৫৮, ১৯৬২ এবং ১৯৭০ তিনটি বিশ্বকাপ জেতেন পেলে। 

চারটি বিশ্বকাপে ১৪ ম্যাচ খেলে ১২ গোল করেন পেলে। কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি রেকর্ড গড়ার আগে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল+ অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড ছিল পেলের। সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপ গোল ও বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড রয়েছে পেলের। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই বিশ্বকাপে গোল ও বিশ্বকাপ জেতেন তিনি। তার এই রেকর্ড এখনও কেউ ভাঙ্গতে পারেননি।

১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে হ্যাটট্রিক এবং ফাইনালে করেছিলেন জোড়া গোল। এরপর ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে এক ম্যাচ খেলে ইনজুরির কারণে আর খেলা হয়নি পেলের। তবে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জেতায় সেটি পেলের জয় হিসেবেও বিবেচিত হয়।

এরপর ১৯৭০ সালের নিজের শেষ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন পেলে। ফাইনালে গোল করে ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় করেন পেলে। সেইসঙ্গে জুলেরিমে ট্রফি চিরতরে নিজেদের করে নেয় ব্রাজিল।

নিজের ক্লাব ক্যারিয়ারে বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সাস্তোসে। ক্লাবের হয়ে প্রায় ১৮ বছর খেলেছেন তিনি। সাস্তোসের হয়ে ৬৩৬ ম্যাচে ৬১৮ গোল করেন পেলে। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে নিউ ইয়র্ক কসমসের হয়ে দুই বছর খেলেন ফুটবল সম্রাট।

ক্যারিয়ারে হাজারের বেশি গোল করা পেলের ফিফা স্বীকৃত অফিশিয়াল গোলের সংখ্যা ৭৫৭টি। পেলের হিসেবে ক্যারিয়ারে তার করা গোলের সংখ্যা ১২৮৩টি। ব্রাজিলের জার্সিতে ৯২ ম্যাচে ৭৭ গোল নিয়ে এখনও তিনিই দেশটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ১৯৯৯ সালে পেলেকে ‘অ্যাথলিট অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আর ২০০০ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস (আইএফএফএইচএস) পেলেকে বিংশ শতাব্দীর সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি দেয়। এছাড়াও তিনি ফিফার ‘প্লেয়ার অফ দ্য সেঞ্চুরি’ খেতাব অর্জন করেন।

পেলেকে ব্রাজিলের ‘অরপ্তানিযোগ্য জাতীয় সম্পদ’ ঘোষণা করেছিলেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট। এ কারণে পেলেকে বিদেশের কোন দলে খেলতে দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি প্রজন্মের কাছে তিনিই ছিলেন ফুটবলের প্রথম আন্তর্জাতিক সুপারস্টার। এর পেছনে আছে পাঠ্যপুস্তকের অবদান। ব্রাজিলের বস্তি থেকে উঠে এসে ফুটবলের রাজা বনে যাওয়া পেলে উঠে এসেছিলেন বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইতে পেলেকে নিয়ে লেখা সেই গল্পটির নাম ছিল ‘কালোমানিক পেলে’। নিঃসন্দেহে পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়াদের কাছে পেলের এই গল্পটি ছিল সেরা পছন্দ। যদিও এই গল্প থেকে পরীক্ষায় খুব একটা প্রশ্ন আসত না। কিন্তু সেই থেকে কালোমানিকের গল্প সবার জানা।

ফুটবল জীবন শেষে পেলে নানা ভূমিকায় ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন রাজনীতিক- ব্রাজিলের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। একজন সম্পদশালী ব্যবসায়ী এবং ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের অ্যাম্বাসেডরও ছিলেন। স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় ঘর আর হুইলচেয়ারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন পেলে। ব্রাজিলের ১৯৭০ বিশ্বকাপ দলের প্রতিনিধি হিসেবে তার মূর্তি উন্মোচনের অনুষ্ঠানেও ছিলেন না। ৮০তম জন্মদিন পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে ঘরে কাটান।

১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর মিনাস গেরাইসের ছোট শহর ট্রেস কোরাকোয়েসে জন্ম পেলের। ফুটবলের সরঞ্জাম কিনতে জুতা পালিশ করতেন। ১১ বছর বয়সে দৃষ্টি কাড়েন তিনি। একজন পেশাদার খেলোয়াড় তাকে সান্তোসের যুব দলে নিয়ে যান। সিনিয়র দলে ঢুকতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৫৬ সালে ১৬ বছর বয়সে ব্রাজিলিয়ান ক্লাবে অভিষেক এবং বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কোলন টিউমার অপসারণ করান পেলে। তার পরিবার কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কেউ বলেনি আর কোথায় ছড়িয়ে পড়েছে ক্যানসার। গত ২৯ নভেম্বর করোনা নিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে ফেরেন এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ধরা পড়ে। গত সপ্তাহে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানান, তার ক্যানসারের অবনতি হয়েছে। বড়দিনও তার সঙ্গে হাসপাতালে করেছেন তার সন্তানরা। ব্রাজিলিয়ান গ্রেটের মৃত্যুশয্যায় পাশে ছিলেন তারা।

ব্রাজিলের ফুটবলকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন পেলে। ফুটবলের সেরাদের তালিকায় শুধু তার পাশে প্রয়াত ডিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম উল্লেখ করা হয়। সব মিলিয়ে তার নামের পাশে গোল ১২৮১টি।

সূত্র: অনলাইন নিউজ